Mon. Mar 4th, 2024
ভাসমান হোটেল

সবজি বিক্রেতা মো. রাজু মিয়া। বয়স ৪০ পেরিয়েছে। বাড়ি ঝিনাইদাহ। পুরো রমজান জুড়ে ভ্যান গাড়িতে এ মহল্লা, সে মহল্লা ঘুরে ব্যবসা করেছেন। ঈদের তিন দিন আগে বাড়িতে স্ত্রী আর দুই ছেলে ও এক মেয়ের জন্য জামাকাপড় আর নগদ টাকা পাঠিয়েছেন। সন্তান আর স্ত্রীর সঙ্গে প্রতিদিনই মোবাইল ফোনে কথা হয় তার। তাদের জানিয়ে দিয়েছেন, ঈদের দুই তিনদিন পর বাড়িতে ফিরবেন।

ঈদে বাড়িতে যাবেন না শুনে বউ-সন্তানদের মন খারাপ হয়নি? জানতে চাইলে রাজু মিয়া কষ্টের হাসি হেসে বলেন, ‘তাতো খারাপ হয়েছেই। কী করবো বলুন, ঢাকায় নিজের মেসের জীবন। বাড়িতে ওরা চারজন। সঙ্গে বুড়ো মা আছেন। সংসারের সব দায়িত্ব আমার ওপর। আরও দুই-তিন দিন কিছু ব্যবসা করে তারপর বাড়ি যাবো। যেতে আসতেও ঝামেলা নেই। থাকবো সপ্তাহ খানেক।’

দীর্ঘ কথা বলে একটু দম নেন রাজু মিয়া। ঈদের আগের দিনই তরকারির ব্যবসা শেষ। গতকাল শনিবার (ঈদের দিন) থেকে গ্রিণরোডে সকালের নাস্তা, দুপুর এবং রাতে ভাতের ভাসমান হোটেল দিয়েছেন। সঙ্গে নিয়েছেন আরও দুজন কারিগর।

কেমন চলছে অস্থায়ী এই হোটেল ব্যবসা? ‘মাশাল্লাহ, আপনাদের দোয়ায় খুব ভালো চলছে’ বলেই হেসে দেন রাজু মিয়া। পান খাওয়া খয়েরি দাঁত বেরিয়ে পড়ে তার। চেহারায় এক ধরনের প্রশান্তি। আস্তে করে বলেন- ‘তিনদিনের ব্যবসায় সব খরচ বাদ দিয়ে হাজার ২০-২৫ টাকা লাভ হবে। সেই টাকা নিয়ে বাড়ি যাবো। বড় মেয়েটা এবার ক্লাস টেনে উঠলো, মেজো ছেলে সেভেনে পড়ে। ছোট মেয়েটা ক্লাস থ্রিতে পড়ে, অনেক খরচ…। তাই একটু বাড়তি আয়ের জন্য এত কষ্ট।’

এখানে যে দোকানদারি করেন, কেউ চাঁদা চায় না? আবারও হাসেন রাজু মিয়া। বলেন, ‘না স্যার, ঈদের সময় তো। সবারই মন মেজাজ ভালো। কিছু বলে না। তবে দু একজন ফ্রি নাস্তা বা দুপুরের খাবার খেয়ে যায়। টাকা দেয় না…।’

কী কী রান্না করেন? জানতে চাইলে রাজু মিয়া বলেন, ‘সকালে পরোটা আর ডাল ও সবজি থাক। দুপুরে ভাত, মাছ, ডাল, গরুর গোস্ত, মুরড়ি এবং পোলাও-মুরগি থাকে। কাস্টমারও মাশাল্লাহ অনেক। গতকালের চেয়েও আজকে কাস্টমার বেড়েছে। সকাল সাড়ে ১০টার সময়ও নাস্তা দিয়ে কুল পাচ্ছি না। আবারও ময়দা মাখাচ্ছি, আরও পরোটা লাগবে।’

রাজু মিয়ার ভাসমান হোটেলের খাবারের মান এবং দাম কেমন? জানতে চাইলে নাস্তা খেতে আসা আল আমিন নামের একজন বলেন, ‘ডাল সবজি দুইটাই স্বাদের। পরোটাও ভালো। দাম একটু বেশি হলেও ঈদের ছুটিতে আমরা যারা বিভিন্ন কারণে বাড়ি যাই না, তাদের তিনবেলা খাবারের ব্যস্থা হচ্ছে এখানে। এটা বিশাল পাওয়া, শহরের প্রায় হোটেল বন্ধ থাকে এসময়।’

দামের ব্যাপারটা রাজু মিয়াও স্বীকার করে বলেন, ‘কী করবো বলুন? দুইজন কারিগর রেখেছি। অন্য সময়ে যাদের বেতন ৫০০-৬০০ টাকা, তাদেরকেই দিনে দেড় হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। পরোটার দাম ১৫ টাকা প্রতি পিস, ডাল- সবজির দাম ২০ টাকা। ফিল্টার পানি ফ্রি খাওয়াচ্ছি। একজনের সকালের নাস্তার খরচ পড়ে ৫০টাকা।’

দুপুর আর রাতে কেমন খরচ পড়ে? একটু হিসাব করে রাজু মিয়া জানান, ‘ভাত ১০ টাকা প্লেট, রুই মাছের পিস ১২০ টাকা, সবজি ২০ টাকা, ডিম রান্না ৩০ টাকা, চিকেন পিস ১৪০ টাকা, গরুর গোস্ত প্লেট ১৫০ টাকা এবং পোলাওর প্লেট ৪০টাকা।’

মূলত কারা খাচ্ছেন এখানে? রাজু মিয়া জানালেন, ‘অনেক ভদ্রলোক ও চাকরিজীবীর পাশাপাশি ঈদে বাড়ি যাননি এরকম মানুষ েএখানে খেতে আসেন। সিএনজি অটোড্রাইভার, রিকশা চালকসহ বিভিন্ন মানুষ এখানে খাচ্ছেন। আশে পাশের তিন-চারটি হাসপাতালের (গ্রিনলাইফ, ল্যাবএইড, সেন্ট্রাল হাসপাতাল) মানুষজন নিয়মিত তিনবেলা খাচ্ছেন আমার এই হোটেলে।’

পরশুদিন (আগামী মঙ্গলবার) দুপুরের খাবার বিক্রি শেষ করে বাড়ির পথে রওনা করবেন বলে জানান রাজু মিয়া। তার অনুমতি নিয়ে তার এবং তার ভাসমান রেস্তোরাঁর ছবি তুললাম। শুভকামনা জানালাম রাজু মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য। এভাবেই কষ্ট আর আনন্দের মধ্যেও নিজের দুটো টাকা আয়ের পাশাপাশি মানুষের জন্য বেঁচে থাক রাজু মিয়াদের মতো মানুষেরা।

আপনার মূল্যবান মতামতটি শেয়ার করুন